Homeশিক্ষামূলকভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার কেন দেওয়া হয়।

ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার কেন দেওয়া হয়।

প্রিয় পাঠকগণ এই নিবন্ধটিতে ভারতের সর্ব্বোচ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার,কেন দেওয়া হয় ? এবং ভারতরত্ন পুরুস্কারের যাবতীয় খুঁটিনাটি,আপনাদের সম্মুখে তুলে ধরা হবে।

এছাড়াও যেহেতু আমরা বাঙালি,তাই ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার প্রাপকদের সূচিতে প্রথম কোন বাঙালি ভারতরত্ন পুরুস্কার পেয়েছিলেন ? তার নামটাও দেখব।

এখন পর্যন্ত কতজন ভারতরত্ন পুরুস্কার পেয়েছেন, ভারতরত্ন পুরুস্কারের জন্য কিভাবে প্রার্থী মনোনয়ন করা হয় ? ভারতীয় নাগরিক ছাড়া,কোন বিদেশি ভারতরত্ন পুরুস্কার প্রাপক হিসাবে মনোনয়ন পেয়েছেন কিনা ?

যদি বিদেশিরা ভারতরত্ন (Bharat Ratna) পুরুস্কার পেয়ে থাকে,তাহলে প্রথম বিদেশি ভারতরত্ন প্রাপক কে ? প্রতিবছর কতজন  নাগরিককে সরকার ভারতরত্ন পুরুস্কার দেয় ?

ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কারের সঙ্গে কোনো প্রাইস মানি সরকার দেয় কিনা ? কোনো নাগরিক ভারতরত্ন পুরুস্কার পেলে সেই পদককে অথবা পদকের শিরোপাকে,

ঐ ব্যক্তি তার নামের আগে ব্যবহার করতে পারবে কিনা ? প্রথম ভারতরত্ন কে পেয়েছেন ? ভারতরত্ন পুরুস্কার কিসের তৈরি ? ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত প্রথম ভারতীয় মহিলা কে ?

আসুন তাহলে আপনাদের মনের মধ্যে চলতে থাকা ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কারের (Bharat Ratna) যাবতীয় জিজ্ঞসার সমাধান করা যাক নিচের নিবন্ধটির মধ্যে দিয়ে।

ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার 


১৯৫৪ সালের ০২ জানুয়ারী ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদের সচিব কাৰ্যালয় থেকে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়।

ঐ প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দুটি বেসামরিক সম্মান চালু করার কথা ঘোষণা করা হয়। এই সম্মান দুটি ছিল ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান -১)ভারতরত্ন এবং ২)পদ্মবিভূষণ।

১৯৫৫ সালের ১৫ ই জানুয়ারী পদ্মবিভূষণ পুরুস্কারকে তিনটি বর্গে ভাগ করে দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয় -১ম পদ্মবিভূষণ,২য় পদ্মভূষণ,৩য় পদ্মশ্রী।

তবে এর মধ্যে ভারতের সর্ব্বোচ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার হল অন্যতম। ভারতরত্ন পদককে ভারতের জাতীয় পুরুস্কার বললে কিছু ভুল বলা হবেনা।

আরো পড়ুন: নোবেল পুরুস্কার কেন দেওয়া হয়। 

ভারতরত্ন পুরুস্কার কেন দেওয়া হয় (Bharat Ratna Award )


ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার কেন দেওয়া হয় ? এর উত্তরে এটাই বলা যায় দেশের নাগরিকের উৎসাহ বর্ধনে উৎকৃষ্টকর্মে দেশ হিতে যোগদানের জন্য,জনগণকে উৎসাহিত করার জন্য

জাতি,ধর্ম,পেশা,বর্ণ ও লিঙ্গ ভেদে সমাজে মানুষের  উঁচু ও নীচু বিভেদ ঘটিয়ে- শিল্পকলা,সাহিত্য,বিজ্ঞান এবং জনসেবায় ,

সর্বোচ্চ স্তরীয় ব্যতিক্রমী যোগদানের জন্য বিশেষ কৃতিধারী ব্যক্তিত্বকে,ভারত সরকারের ভারতরত্ন নির্বাচন কমিটি দ্বারা ভারতরত্ন দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করা হয়।

ভারতরত্ন নির্বাচন কমিটির অধক্ষ্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারতরত্ন (Bharat Ratna) প্রাপকের নাম মাননীয় রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করেন।

২০১১ সালে ভারত সরকারের উদ্যোগে নতুন করে ভারতরত্ন মনোনয়ন কমিটি মানবতা/ মানবিক কৃতিত্বের জন্য ভারতরত্ন দেবে বলে ঠিক করেন।

ভারতরত্ন নির্বাচন কমিটির নিয়ম অনুযায়ী এক বছরে সর্বাধিক ০৩ জন ব্যাক্তিকে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া যেতে পারে।

ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। 4 1

তবে একবার  এই ঘটনার ব্যাতিক্রম দেখতে পাওয়া যায়। ১৯৯৯ সালে একই সঙ্গে ০৪ জনকে জনকে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়-

০১.জে.পি.নারায়ণকে,সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে জনস্বার্থে বিভিন্ন আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে যোগদান এবং জনহিতৈষী কার্যকরণের জন্য ভারতরত্ন দেওয়া হয়।

০২. অমর্ত্য সেন,আপনারা সবাই জানেন অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতিতে অসামান্য যোগদানের জন্য নোবেল কমিটি নোবেল পুরুস্কার দেয়।

এহেন প্রতিভার মূল্যায়ন যখন ভারত করতে পারেনি,তখন অমর্ত্য সেনের সম্মানে অমর্ত্য সেনকে অর্থনীতিতে অসামান্য যোগদানের জন্য ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়।

০৩.গোপীনাথ বরদলৈ,ইনি আসামের ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ পর্যন্ত আসামের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। আসাম রাজ্যকে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের অংশ হওয়া

থেকে ছিনিয়ে,ভারতের সঙ্গে যুক্ত করার পিছনে গোপীনাথ বরদলৈকে অটল বিহারি বাজপায় দ্বারা ভারতরত্নের জন্য মনোনীত করা হয়। 

০৪.রবিশঙ্কর,বিখ্যাত সেতার বাদক রবিশঙ্করকে হিন্দুস্থানী শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জন্য ভারতরত্ন দেওয়া হয়। এর আগে রবিশঙ্করকের ০৪ বার গ্যামি পুরুস্কারে সম্মানিত করা হয়েছিল।

আশা করি ভারতরত্ন পুরুস্কার কেন দেওয়া হয় ? এই প্রশ্নের উত্তরের একটা স্বচ্ছ ধারণা আপনারা উপরের আলোচনায় পেয়ে গেছেন।

আরো পড়ুন : কালাপানি জেলের ইতিহাস। 

ভারতরত্ন প্রাপকের তালিকা


১৯৫৫ সালে ভারতরত্ন মনোনয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কারের জন্য,

ডঃ সি.ভি.রমন,এস.রাধাকৃষ্ণন এবং সি.গোপালাচারী,এই তিন জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম মনোনীত করে মাননীয় রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান।

ডঃ সি.ভি. রমন কে রমনের আবিষ্কৃত রমন ইফেক্টের জন্য ভারতরত্ন দেওয়া হয়। সি.গোপালাচারী কে ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের রূপরেখা তৈরির কারিগর বলে মনে করা হয়।

যদিও গান্ধীজিকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। কিন্তু চক্রবর্তী রাজা গোপালাচারীর যোজনা অনুযায়ীই গান্ধীজি ভারত ও পাকিস্তান বিভাজনের জন্য হ্যাঁ বলেছিলেন।

১৯৫৫ সালে এই তিনজনকে একইসাথে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ডাঃ রাজেন্দ্র প্রসাদ দ্বারা ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন (Bharat Ratna) দেওয়া হয়।

ঐ বছর ১৯৫৫ সালে রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে মরণোত্তর ভারতরত্ন দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়। এর পরে প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর,

তাসখন্দ চুক্তি করতে গিয়ে আকস্মিক মৃত্যু হলে,লাল বাহাদুর শাস্ত্রীকে সর্বপ্রথম ১৯৬৬ সালে মরণোত্তর ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়।

এখন পর্যন্ত সর্বশেষ ২০১৯ সাল পর্যন্ত ভুপেন হাজারিকা এবং নানাজী দেশমুখ সহ সবমিলিয়ে ১৬ জনকে মরণোত্তর ভারতরত্ন দিয়ে সম্মানীত করা হয়েছে।

১৯৯২ সালে সুভাষ চন্দ্র বোস কে মরণোত্তর ভারতরত্ন দেওয়ার কথা ঘোষণ করা হয়। কিন্তু নেতাজীর  মৃত্যু রহস্য নিয়ে সংশয় থাকায় নেতাজীর পরিবার,

মরণোত্তর নেতাজীর ভারতরত্ন (Bharat Ratna) নেওয়ার জন্য মানা করে দেয়। এরপর নেতাজীর অফিসিয়াল কোনো মৃত্যু দিবস না থাকায়,

শেষ পর্যন্ত ১৯৯৭ সালে সুপ্রীম কোর্টের তত্ত্বাবধানে নেতাজীর নাম ভারতরত্ন (Bharat Ratna) থেকে ফেরত নেওয়া হয়।

সমালোচনায় স্থগিত রাখা হয়েছিল ভারতরত্ন পুরুস্কার 


পুরোনো ইতিহাসের দলিল ঘেটে দেখলে দেখতে পাওয়া যায় এখনও পর্যন্ত সব মিলিয়ে ০২ বার ভারতরত্ন পুরুস্কার স্থগিত রাখা হয়েছে।

১ম বার- ১৯৭৭ সাল থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অকংগ্রেসী সরকারে মুরারী দেশাই প্রধানমন্ত্রী হয়ে ক্ষমতায় এলে ভারতরত্ন (Bharat Ratna) বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় এলে ১৯৮০ সালে পুনঃরায় ভারতরত্ন আবার চালু চালু করা হয়। অকংগ্রেসী সরকারের মতানুযায়ী,

এখন পর্যন্ত যতজনকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে তাদের বেশিরভাগেরই কংগ্রেস মহলে অন্তরঙ্গ ঘনিষ্ঠ ছিল।

তাই ভারতরত্ন চয়ন কমিটি দ্বারা সঠিক ব্যক্তিত্বকে মনোনয়ন করে ভারতরত্ন দেওয়া হয়নি। তাদের মতে ভারতরত্নের প্রতিভা নির্বাচনে ভেদভাব করা হয়েছে।

এর প্রতক্ষ প্রমান স্বরূপ ১৯৫৫ সালে পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু মহাশয়কে ভারতরত্ন পুরুস্কার প্রদান করা হয়। আর সংযোগ দেখুন ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত,

স্বয়ং জওহরলাল নেহেরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। ভারতরত্ন চয়ন কমিটির প্রধান হিসাবে গণ্য করা হয় স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকে। তিনিই ভরতরত্নের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে নাম সুপারিশ করেন।

তাহলে নেহেরুজী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি নিজে নিজেই কিভাবে ভারতরত্নের জন্য নিজের নাম মনোনয়ন করতে পারেন। যেটা অকংগ্রেসী দলের পছন্দ হয়নি।

আবার ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখতে পাওয়া যায় জওহরলাল নেহেরুরুর মেয়ে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হলে।

১৯৭১ সালে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে ভারতরত্ন দেওয়া হয়। এক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা,সেই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন স্বয়ং ইন্দিরা গান্ধী নিজেই।

আর ভারতরত্নের (Bharat Ratna) জন্য শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী নিজে নিজের নাম মনোনীত করে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠান। ১৯৭১ সালে ভারতের সর্বপ্রথম মহিলা হিসাবে ইন্দিরা গান্ধী ভারতরত্ন পায়

২য় বার- ভারতরত্ন বন্ধ করে দেওয়া হয় ১৯৯২ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত। ১৯৯২ সালে কেরালা এবং মধ্য প্রদেশ হাইকোর্টে জনস্বার্থে একটি মামলা দায়ের করা হয়। 

আগেকার দিনে যেমন অনেক নিজের নামের আগে ব্রিটিশ প্রদত্ত নাইট হুড আদি উপাধি ব্যবহার করতো। যেগুলো সমাজে উঁচু নিচু ভেদভাব সৃষ্টি করতো।

কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের ১৮ নং অনুচ্ছেদে নামের আগে উপাধি ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে, উপাধি জিনিসটা পুরোপুরি লুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে।

তাই ভারতরত্নকে নামের সাথে উপাধি হিসাবে ব্যবহারের উপর জনস্বার্থে হাইকোর্টে মামলা করা হয় এবং সমস্যা এতটা গম্ভীর হয়ে যায় যে এই মামলা সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

অবশেষে ১৯৯৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দেয় ভারতরত্ন কোনো উপাধি নয়। ভারতরত্ন শুধু নাগরিক সম্মান মাত্র।

কোনো ব্যক্তি নামের আগে,যদি সে ভারতরত্ন পেয়ে থাকে তাহলে তার নাম নেওয়ার আগে ভারতরত্ন (Bharat Ratna) উচ্চারণ  করা যেতে পারে।

কিন্তু সে ভারতরত্নকে নিছক উপাধি হিসাবে নামের আগে নাইট হুড,ডঃ এর মত ব্যবহার করতে পারবেনা। ব্যাবহার করতে পারবে না। এরপর ১৯৯৫ সালের পর থেকে পুনরায় ভারতরত্ন দেওয়া শুরু হয়।

আরো পড়ুন : অভিশপ্ত কোহিনুর হীরার ইতিহাস। 

ভারতরত্ন পুরুস্কার কিসের তৈরি


অনকের মনে প্রশ্ন ওঠে আসলে ভারতরত্ন পুরুস্কার কিসের তৈরি ? যাদের মনে এই সমস্ত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তারা তাদের প্রশ্ন,ভারতরত্ন পুরুস্কার কিসের তৈরি ? এই প্রশ্নের উত্তর তারা পেয়ে যাবে নিচের আলোচনায়।

১৯৫৪ সালে শুরুর দিকে ভারতরত্ন পদকের আকার ছিল ৩৫ মিমি ব্যাস বিশিষ্ট গোলাকার একটি সোনার পদক। পদকের সামনে দিকে একটি সূর্যের প্রতিচ্ছবি খোদায় করা থাকত।

ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। 1 1

তার উপর চাঁদির প্লেট দিয়ে দেবনগরী লিপিতে ভারতরত্ন কথাটি লেখা থাকত এবং পদকের পিছনে অশোক স্তম্ভ এর নিচে সত্যম জয়তে লেখা থাকত।

কিন্তু সময়ের সাথে এই পদকের ডিজাইনে পরিবর্তন আনা হয়। ১৯৫৫ সালে পদকের নকশায় আমরা বড়সড় পরিবর্তন দেখতে পায়।

পদকের আকৃতি করে দেওয়া হয় আমাদের অশ্বথ গাছের পাতার আদলে। অশ্বথ পাতাটি তামার প্লেটের উপর খোদিত থাকে। আর  এই অশ্বথ পাতার মাঝখানে প্লাটিনাম দিয়ে সূর্য খোদায় করা থাকে।

সূর্যের নিচে চাঁদির হরফে ভারত রত্ন লেখা থাকে। আর এর পিছনদিকে আগের মতো সারনাথের চারসিংহ মাথা খোদিত,যাকে আমরা অশোক স্তম্ভ বলি।

অশোক স্তম্ভের নিচে মুণ্ডক উপনিষদ থেকে নেওয়া সত্যম জয়তে কথাটি লেখা থাকে। এই পদকটি একটি সাদা ফিতে দিয়ে ভারতরত্ন প্রাপকের গলায় ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

আপনাদের জ্ঞাতার্থে জানিয়ে রাখি ভারতরত্ন পদক ছাড়াও আরো অন্যান্য বড় বড় পদকগুলি যেমন- পদ্মশ্রী এবং সেনাদের পরমবীর চক্রের মত সব পদকই, আমাদের পচিমবঙ্গের আলিপুর টাঁকশালে তৈরি করা হয়।

আসা রাখি এতক্ষনে নিশ্চয় ভারতরত্ন কিসের তৈরি ? এই সম্বন্ধিত উত্তরটি আপনারা হুবহু পেয়েগেছেন। আসুন তাহলে আমরা পরবর্তী পংক্তির দিকে এগিয়ে যায়।

ভারতরত্নের মূল্যায়ন ( Bharat Ratna appraisement)


ভারতরত্ন পুরুস্কার প্রাপককে ভারতরত্ন পদকের সঙ্গে আলাদা করে কোনো রকমের অর্থ দিয়ে সাহায্য করা হয় না। ভারতরত্ন প্রাপককে পদকের সাথে,

মাননীয় রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর করা একটি শংসাপত্র প্রদান করা হয়। তবুও এই ভারতরত্ন পুরুস্কারের আকাঙ্ক্ষী  মানুষ কেন ?

কি এমন মহত্ত্ব রয়েছে ভারতরত্ন পদকের,যে কোনো রকম টাকা পয়সার লোভ নির্দেশক কিছু না থাকা স্বত্তেও মানুষ স্বপ্ন দেখে ভারতরত্ন পাওয়ার জন্য।

আসুন তাহলে ভারতরত্ন পুরুস্কারের একটু অন্যরকম ভাবে মূল্যায়ন করা যাক। আমাদের দেশ ভারতবর্ষের জনসংখ্যা প্রায় ১১০ কোটি ৪০ লক্ষ ছুঁই ছুঁই।

এতো বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে আমাদের দেশের প্রথম নাগরিকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে আমাদের দেশের রাষ্ট্রপতিকে।

তার পর দ্বিতীয় নাগরিক হলেন উপরাষ্ট্রপতি এরপর তৃতীয় নাগরকিক হলেন আমাদের দেশের প্রধানমন্ত্রী,চতুর্থ হলেন গভর্নর,পঞ্চম নাগরিক হলেন আমাদের দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি গণ ।

ষষ্ঠ নাগরিক হলেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (Chief Justice of Supreme Court) এবং পর্যায় ক্রমে আমাদের দেশের সপ্তম নাগরিক হলেন আমাদের দেশের ভারতরত্ন প্রাপকগণ।

তাহলে বুঝতে পারছেন ভারতরত্ন শুধু মাত্র পুরুস্কার নয়,ভারতরত্ন প্রাপকরা আমাদের দেশের সপ্তম বা ০৭ নং নাগরিক। যেটা ভারতরত্ন প্রাপকের কাছে কতটা সম্মানের।

এছাড়াও ভারতরত্ন (Bharat Ratna) প্রাপকে গোল্ডেন পাস দেওয়া হয়। যার দৌলতে দেশ,বিদেশে হাওয়াই যাত্রা এবং ট্রেন যাত্রা করার জন্য বিনামূল্যে সংরক্ষণ টিকিট পাওয়া যায়।

ভারতরত্নের বিদেশী প্রাপক


ভারতরত্ন (Bharat Ratna) জাতি,ধর্ম বর্ণ ও লিঙ্গ নির্বিশেষে,ভারতের নাগরিকের পাশাপাশি বিদেশী নাগরিক দিকেও দেওয়া হয়।

আজ পর্যন্ত তিন জন বিদেশী নাগরিককে ভারতরত্ন দেওয়া হয়েছে- ০১.খান আব্দুল গাফফার খানকে ১৯৮৭ সালে ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়। 

খান আব্দুল গাফফার খান,যিনি সীমান্ত গান্ধী নামে পরিচিত। ইনি ভারত থেকে পাকিস্তানকে আলাদা করার তীব্র বিরোধীতা করছিলেন। তিনি ভারত থেকে পাকিস্তান আলাদা হোক তা চাননি।

ইনি একজন নরমপন্থী গান্ধীবাদী নেতা ছিলেন। যদিও পরে ভারত থেকে পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে গেলে গাফফার খান পাকিস্তানের নাগরিকত্ব লাভ করেন।

পরে খান আব্দুল গাফফার খানের মৃত্যু হলে খান আব্দুল গাফফার খানকে আফগানস্থানে দাফন করে কবর দেওয়া হয়।

০২.দ্বিতীয় ব্যক্তি ভারতরত্নের বিদেশী প্রাপক হলেন আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নেলসন মেন্ডেলা। যিনি তার যুবা অবস্থার ২৬ বছর জেলে কাটিয়েছিলেন।

নেলসন মেন্ডেলার আগে কোনো কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি আফ্রিকার কোনো সরকারি এবং রাজনৈতিক পদে আসীন হতে পারতেননা।নেলসন মেন্ডেলা এর জন্য আন্দোলন চালিয়ে যান।

এর ফল স্বরূপ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসাবে রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হন। মেন্ডেলার এই ব্যতিক্রমী কার্যের জন্য ১৯৯০ সালে নেলসন মেন্ডেলাকে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়।

নেলসন মেন্ডেলার অটো বায়োগ্রাফি নিয়ে লেখা বইটি হল Long walk to Freedom বইটি দেখার জন্য এখানে Click ⇒করুন। 

০৩. তৃতীয় বিদেশী হিসাবে মাদার টেরিজার নাম সামনে আসে। কিন্তু তাকে ভারতীয় বলেই গণ্য করা হয়। তিনি তার জীবনের শেষ দিন অবধি ভারতেই ছিলেন।

ভারতরত্নের মহিলা প্রাপক


এখন পর্যন্ত সবমিলিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লাস্ট ৪৮ জনকে ভারতরত্ন পেয়েছেন। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর কারণে কাওকে ভারতরত্ন দেওয়া হয়নি।

এই ৪৮ জন ভারতরত্ন প্রাপকের মধ্যে সবমিলিয়ে মোট ০৫ জন মহিলা আজ পর্যন্ত ভারতরত্ন পুরুস্কার পেয়েছেন।

০১.ভারতের প্রথম মহিলা হিসাবে ভারতরত্ন পায় ইন্দিরা গান্ধী। ইন্দ্রা গান্ধীকে ভারতের লৌহ মানবী বলা হয়। ১৯৭১ সালে ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে,পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশকে,

আলাদা করার জন্য,বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন করেন, যার ফলে স্বাধীন দেশ বাংলাদেশ গঠিত হয়। ইন্দিরা গান্ধীর এই অসাম্য যোগদানের জন্য ইন্দিরা গান্ধীকে ১৯৭১ সালে ভারতরত্ন দেওয়া হয়।

০২. ভারতরত্নের দ্বিতীয় মহিলা পুরুস্কার প্রাপক হলেন মাদার টেরেসা। ১৯৮০ সালে মাদার টেরিজাকে ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়।

যদিও মাদার টেরিজা ছিলেন একজন বিদেশী নাগরিক। তবুও তাকে ভারতীয় মহিলা হিসাবেই ধরা হত। তাই বিদেশী ভারতরত্ন প্রাপকের সূচিতে মাদার টেরিজা কে সামিল করা হয়না।

মাদার টেরিজা হলেন একজন ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী, যিনি মিশনারি অফ চ্যারিটির প্রতিষ্ঠাতা। মাদার টেরিজাকে “ব্রেজড মাদার টেরিজা” অফ কলকাতা বলা হত।

১৯৭৯ সালে শান্তির জন্য মাদার টেরিজা নোবেল দেওয়া হয়। এর পরের বছর ১৯৮০ সালে জনসেবা এবং সেবা মূলক কাজের জন্য ভারত সরকার দ্বারা মাদার টেরিজাকে ভারতরত্ন দেওয়া হয়।

০৩.ভারতরত্নের তৃতীয় মহিলা পুরুস্কার প্রাপক হলেন অরুণা আসিফ আলী। হরিয়ানার এই সাহসী মহিয়সী মহিলাকে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে ভারতরত্ন দেওয়া হয়। 

ইনি গান্ধীজীর সাথে ১৯৪২ সালে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে পতাকা হাতে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান

এবং মুম্বায়ের গোয়ালিয়র ট্যাংক ময়দান থেকে গান্ধীজীর সাথে ২৪২ কিমি ডান্ডি অভিযান পদযাত্রায় একজন মহিলা হিসাবে সক্রিয় যোগদান দেন।

০৪. চতুর্থ মহিলা ভারতরত্ন প্রাপক হলেন এস.এস সব্বুলক্ষী। ১৯৯৭ সালে এস.এস.সব্বুলক্ষী দেবীকে কর্নাটকী শাস্ত্রীয় সংগীতে অনবদ্য যোগদানের জন্য ভারতরত্ন দেওয়া হয়।

০৫. পঞ্চম মহিলা ভারতরত্ন প্রাপক হলেন কণ্ঠ শিল্পী লতা মঙ্গেশকর। ২০০১ সালে কণ্ঠ শিল্পী লতা মঙ্গেশকরকে ভারতরত্ন দেওয়া হয়। লতাকে ভারতের নাইটেঙ্গেল বলা হয়।

খেলাধুলায় অনবদ্য যোগদানের জন্য ভারতরত্ন পুরুস্কার


২০১৪ সালে কংগ্রেস সরকারে আসীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ডঃ মনমোহন সিং সচিন টেন্ডুলকারের নাম ভারতরত্নের জন্য রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করেন।

এর আগে পর্যন্ত কোনো খেলোয়াড়কে ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়নি। এই নিয়ে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায় অনেক। সমালোচকদের মতে খেলাধুলার জগতে ধ্যান চাঁদের হকিতে অনবদ্য যোগদান আছে।

তাহলে খেলাধুলায় যদি কাওকে ভারতরত্ন দিতে হয়,তাহলে প্রথমে হকির জাদুগর ধ্যান চাঁদ এবং মিল্কা সিং কে দেওয়া উচিত।

ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান। 2 1

আবার বিরোধীদের মতে সচিন তখন রাজ্যসভার কংগ্রেসের একজন MP ছিলেন, তাই সচিনের নাম ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার (Bharat Ratna) এর জন্য নেওয়া হয়।

অবশেষে সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ২০১৪ সালে সবথেকে কনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসাবে ৪০ বছর বয়সে সচিন টেন্ডুলকার ভারতরত্ন লাভ করে।

সবথেকে বরিষ্ঠ ভারতরত্ন প্রাপকের তালিকায় ধন্দ কেশব কর্বে মহাশয়ের নাম রয়েছে। ১৯৫৮ সালে ধন্দ কেশব কর্বে মহাশয়কে তার ১০০ তম জন্ম তিথিতে ভারতরত্ন দেওয়া হয়।

ধন্দে কেশব কর্বে মহাশয়কে মহাঋষি কর্বে বলা হয়। তার নারী শিক্ষা,হিন্দু বিধবা বিবাহ আন্দোলন এবং শ্রীমতি নাথিবাই দামোদর থাকারসে মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় আদি মহৎ কাজের জন্য ভারতরত্ন দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক ভারতরত্ন প্রাপক ( Recent Bharat Rtatna Award Recipient )


২০১৯ সালে সর্বশেষ ০৩ জনকে ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়েছে । এর মধ্যে ০২ জনকে মরণোত্তর ভারতরত্ন দেওয়া হয়েছে।

০১. রাজ্য সভার প্রাক্তন সদস্য নানাজী দেশমুখকে মাননবিক কাজকর্মের জন্য মরণোত্তর ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়।

০২.আসামের সংগীত শিল্পী ভুপেন হাজারিকাকে মরণোত্তর ভারতরত্ন দেওয়া হয়। তিনি অসমীয়া সংগীতকে বলিউড তথা বিশ্বের কাছে নতুন পরিচিতির দিশা দেখিয়েছিলেন।

০৩. ভারতের ১৩ তম রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়কে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর গ্রহণের পর বিজেপি সরকারের মনোনয়নের দ্বারা ভারতের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান ভারতরত্ন পুরুস্কার দেওয়া হয়।

FAQ


প্রঃ কোন বাঙালি প্রথম ভারতরত্ন (Bharat Ratna) পান ?                                                              উঃ-১৯৬১ সালে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় সর্বপ্রথম বাঙালি হিসাবে ভারতরত্ন পান।

প্রঃ পশ্চিমবঙ্গে কে প্রথম ভারতরত্ন পান ?                                                                             উঃ-ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়

প্রঃ দ্বিতীয় বাঙালি ভারতরত্ন কে পান ?                                                                                   উঃ সত্যজিৎ রায় ১৯৯২ সালে ভারতরত্ন পান।

প্রঃ ভারতের প্রথম কোন বাঙালি রাষ্ট্রপতি ভারতরত্ন পুরুস্কার পান ?                                                 উঃ ২০১৯ সালে ভারতের ১৩ তম রাষ্ট্রপতি ভারতরত্ন পান।

প্রঃ অমর্ত্য সেন কতসালে ভারতরত্ন পান ?                                                                             উঃ- ১৯৯৮ সালে অমর্ত্য সেন নোবেল পুরুস্কার পান।

প্রঃ এখন পর্যন্ত কতজন ভারতরত্ন পেয়েছেন ?                                                                         উঃ সবমিলিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ সবমিলিয়ে ৪৮ জন ভারতরত্ন পুরুস্কার পেয়েছেন।

প্রঃ মরণোত্তর কতজন ভারতরত্ন পেয়েছেন ?                                                                          উঃ- ২০১৯ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ ১৬ জন মরণোত্তর ভারতরত্ন পেয়েছেন।

প্রঃ কতজন মহিলা ভারতরত্ন পেয়েছেন ?                                                                              উঃ- ২০১৯ সাল পর্যন্ত সব মিলিয়ে ০৫ জন মহিলা এখন পর্যন্ত ভারতরত্ন পেয়েছেন।

প্রঃ কতজন রাষ্ট্রপতি ভারতরত্ন পেয়েছেন ?                                                                             উঃ ০৬ জন রাষ্ট্রপতি ভারতরত্ন পেয়েছেন।

প্রঃ কতজন বিদেশী নাগরিক ভারতরত্ন পেয়েছেন ?                                                                    উঃ ০২ জন বিদেশী নাগরিককে ভারতরত্ন  দেওয়া হয়েছে।

a6cc12293fccf681cf15518ca50544bd?s=117&d=mm&r=g
KRISHNA SAHUhttps://www.sonobangla.com
আমি মনে ও প্রাণে একজন বাঙালি,তাই বাঙালি এবং বাংলা ভাষাকে ভালোবাসি। বাংলা ভাষার মধ্যে দিয়ে আপামর বাঙালির মনে বিভিন্ন ঘটনার বিশ্লেষিত প্রেক্ষাপটের বোধগম্য চিত্র ফুটিয়ে তোলায় আমার লেখনীর মূল উদ্দেশ্য।
RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular