বিপ্লবীদের রক্ত রঞ্জিত কালাপানি সেলুলার জেলের গল্প কথা।

0

আজকে আমরা অবগত হব আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস সমন্ধে। ঠিক কি কারণে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের মত নিরিবিলি জায়গায়

ব্রিটিশরা সেলুলার জেল (Kalapani jail) নির্মাণ করেছিল। জানব স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বলিদানের রক্ত রঞ্জিত আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাসের পুরোনো দলিলে,

বর্ণিত স্বাধীনতার স্বার্থে জীবন উৎসর্গীত বিপ্লবীদের বীর গল্প কথা। কালাপানি সেলুলার (Kalapani jail) জেলে ব্রিটিশদের দ্বারা স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের উপর কিভাবে নির্মম ও বর্বর অত্যাচার করা হত।

কেন মানুষ কালাপানির সাজা শুনলে শিউড়ে উঠত। সেলুলার জেল আন্দামান ইতিহাসের পাতায় কিভাবে হয়ে উঠল কালাপানির সাজা,

চলুন তাহলে আমাদের মনের মধ্যে থাকা সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যাক আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস নিবন্ধটি পাঠ করে।

আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস


আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস,কালাপানি সাজা কি ? জানার আগে আমাদের আগে আন্দামান সম্পর্কে জানা দরকার। আন্দামান হল ভারতবর্ষের ০১ টি কেন্দ্র শাষিত প্রদেশ।

কথিত আছে আন্দামান দ্বীপের নামকরণ হয় রামায়ণে বর্ণিত বানর দেবতা হনুমানের নাম অনুসারে। হনুমান কথাটি এসেছে হান্দুমান থেকে,

হান্দুমান শব্দটি মলয় ভাষা থেকে নেওয়া হয়েছে,যা পরে হান্দুমান থেকে আন্দামান হয়েছেনিকোবর শব্দটির মলয় ভাষায় অর্থ হল নগ্নলোকের ভূমি।

শোনা যায় রামচন্দ্র রাবনের লঙ্কায় আন্দামান থেকে আক্রমনের পরিকল্পনা নেন এবং পরে ধনুস কুঠি থেকে রামচন্দ্র বানর সেনা সহ লঙ্কা আক্রমন করেন।

আন্দামানে জড়োয়ার জনজাতির লোক বসবাস করে, যাদের আদি বংশধর আফ্রীকা থেকে এসেছিল,জড়োয়ার জাতির লোকেরা আজও যাযাবরের মত জীবন যাপন করে।

এরা আধুনিকতার ধরাছোঁয়ার অনেক বাইরে, এরা কোন কাপড় পরিধান করেনা গাছের পাতা ও গাছের ছাল পড়েই নিজেদের লজ্জা আবরণ করে।

জড়োয়ার জনজাতির সংরক্ষণের জন্য ভারত সরকার কঠোর আইন প্রণয়ন করেছেন,বিভিন্ন স্বেছাসেবি সংগঠন জড়োয়ার প্রজাতির মানুষদের রক্ষণের জন্য এগিয়ে এসেছেন।

জড়োয়ার জনজাতির লোক সংখ্যা দিন প্রতিদিন  কম হচ্ছে বর্তমানে এরা ৫০০ এর থেকে কম সংখ্যায় আন্দামানের বুকে বেঁচে আছে।

তাই আন্দামানের যে সমস্ত জায়গায় জড়োয়ার জাতির লোকেদের বাস রয়েছে সেই সমস্ত জায়গায় পর্যটকদের যাওয়া নিষেধ।

আন্দামানে মোট ৫৭২ টি আয়ারল্যান্ড আছে তার মধ্যে ৩৬ টি আয়ারল্যান্ড মানুষের বসবাস করার জন্য  উপযুক্ত। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রফল উত্তর থেকে দক্ষিণে ৭০০ বর্গ কিমি।

আন্দামানের মোট ক্ষেত্রফলের ৫২ % জমি ঘন জঙ্গলে ঢাকা। এখানে পৃথিবীর বিরল প্রজাতির আকারে সবথেকে ছোট কচ্ছপ ওয়েব রেডলি দেখতে পাওয়া যায়।

আমরা আগেকার দিনের পুরোনো ২০ টাকার নোটে নারকেল গাছ ঘেরা ছাপানো যে ছবিটি দেখতে পায় সেটা আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের ছবি।

আরো পড়ুন : জগন্নাথ মন্দিরের রহস্য। 

কালাপানি সেলুলার জেল কোথায় অবস্থিত (Kalapani jail in India)


১৭৭৯ সালে ইংরেজরা নৌবহরে এসে আন্দামান দ্বীপে পৌঁছায়। আন্দামানের নিরিবিলি পরিবেশ,উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ,উন্মুক্ত নীল আকাশ ইংরেজদের মেম সাহেবদের খুব পছন্দ হয়।

আন্দামানের কালাপানি সেলুলার
আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেল

পরে ইংরেজ লাট সাহেবরা আন্দামানে তাদের নৌ-সেনাবহর,ইংরেজ কলোনি,অফিস ঘাট তৈরি করেন। তৎকালীন সময়ে ভারত সহ বার্মা,পোত্রগাল,মাল্লাকা,পেলাই,সিংগাপুর প্রভৃতি দেশে

ইংরেজদের উপনিবেশ ছিল। আন্দামানে ইরেজরা তাদের প্রভুত্ব থাকা দেশগুলি থেকে বিভিন্ন কয়েদিকে সাজা কাটানোর জন্য নিয়ে এসে আন্দামানের রাস্তা,ঘাট ইত্যাদি নির্মাণ করেন।

ভারত ছাড়াও অন্যান্য দেশে, যে সমস্ত লোকেরা নিজেদের স্বাধীনতার স্বার্থে ইংরেজদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত তাদের শায়েস্তা করার জন্য সাজা দিত।

কিন্তু হলে কি হবে বিপ্লবীর রক্ত,রক্ত বীজের ন্যায় দেশের তরুণ দিকে স্বাধীনতার স্বার্থে গর্জে ওঠার আহ্বান জানাত। এই সমস্ত তরুণ বিপ্লবীরা ইংরেজের সাজার তোয়াক্কা না করে

ইংরেজদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করলে,ইংরেজদের রাজ্য শাসনের ক্ষেত্রে প্রধান বাধার কারণ হয়ে সামনে আসে।

সেই স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের দেখে যাতে নতুন প্রজন্ম অনুপ্রেরণা না পায় তার জন্য,ইংরেজরা বিপ্লবীদের সাথে সাধারণ মানুষের জনসংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চাইছিল।

১৭৯০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাইড্রোফিগার ক্যাপ্টেন ব্লেয়ার এবং সার্ভেয়ার জেনারেল ইন্ডিয়ার কর্নেল কোল বুক এর পরামর্শে ইন্ডিয়ান ব্রিটিশ গভর্মেন্ট 

বিপ্লবী বন্দিদের আন্দামানের ছাতিম দ্বীপে এনে রাখার পরামর্শ দেন। এরপর থেকে স্বাধীনতার স্বার্থে তরুণ বিপ্লবীদের দমনের জন্য ইংরেজরা ফাঁসি না দিয়ে

দ্বীপান্তর সাজা দেওয়ার প্রথা চালু করেন। ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ সমুদ্রের মাঝে থাকায় সাধারণ মানুষ থেকে বিপ্লবী বন্দিদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ছাতিম দ্বীপে কয়েদিদের থাকার জন্য বস্তি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আন্দামানে নোনা,স্যাঁতসেঁতে প্রতিকূল জলবায়ুর কারণে কয়েদীদের মৃত্যু হতে থাকে।

এরপর ইন্ডিয়ান ব্রিটিশ গভমেন্টের আদেশে ১৭৯৬ সালের পর থেকে আন্দামানে কয়েদীদের নিয়ে আসা বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আরো পড়ুন : টাইটানিক জাহাজ ডোবার আসল কারণ। 

কালাপানি সেলুলার জেল নির্মাণ


১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের নায়ক মঙ্গল পান্ডে কার্তুজে শুয়োরের চর্বি মেশানো কে কেন্দ্র করে সিপাহী বিদ্রোহের সুচনা করে।

সেই বিদ্রোহের আগুনের ফুলকি ভারতবর্ষের আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। মঙ্গল পান্ডের ছড়ানো বিদ্রোহের আগুনে সারা দেশটা জ্বলে ওঠে।

সিপাহী বিদ্রোহের আগুনকে মানুষের মন থেকে নেভানোর জন্য বিপ্লবী বিদ্রোহীদের জনসম্মুখ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ইংরেজ সরকার।

বিদ্রোহীদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য ইংরেজদের দ্বারা পোর্টব্লেয়ারে স্থায়ীভাবে একটি জেল বানানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

১৮৯০ সালে ছাতিম দ্বীপে,দ্বীপান্তর করা যুদ্ধ বন্দিদের মৃত্যুর কারণ খুঁজে বার করার জন্য ইংরেজ সরকার একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন।

অনুসন্ধান কমিটি তাদের রিপোর্টে বন্দিদের মৃত্যুর কারণ হিসাবে প্রতিকূল জল আবহাওয়া,কয়েদীদের উপর ইংরেজদের অকথনীয় মাত্রারিক্ত অত্যাচারকে দায়ী করেন।

পরবর্তীকালে কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী অতিরিক্ত সাজার পরিবর্তে কয়েদীদের আলাদা আলাদা কুঠুরিতে রাখার নির্দেশ দেন।

কারণ ইংরেজ সরকার বুঝে গেছিল জেলবন্দীদের আলাদা,আলাদা কুঠুরিতে বন্দী করে রাখলে ধীরে,ধীরে তাদের মনোবল ভেঙে পড়বে বন্দীরা একে অপরের কাছে ভাব বিনিময়ের সুযোগ পাবেন না।

অনুসন্ধান কমিটির এই নির্দেশ আন্দামান নতুন করে জেল বানানোর রাস্তা করে দেয়। ১৮৯৩ সালে কালাপানি সেলুলার জেলের ভিত্তি প্রস্তর রাখা হয়।

১৮৯৬ সাল থেকে কালাপানি সেলুলার জেলের নির্মাণ কাজ শুরু করা হয় এবং জেল তৈরি শেষ হয় ১৯০৬ সালে। জেল বানানো শেষ হয়ে গেলে

তারপর থেকে ব্রিটিশদের হাতে গ্রেফতার হওয়া বিপ্লবীদের আন্দামানের কালাপানি সাজা জেলে (Kalapani jail) পাঠিয়ে দেওয়া হত। কালাপানি সেলুলার জেল নির্মাণে মোট ১৩ বছর সময় লাগে।

কালাপানি সেলুলার জেল নির্মাণ করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দ্বারা। ইংরেজরা যে সমস্ত বিপ্লবীদের বন্দী করে নিয়ে যেত তাদিকে ব্যবহার করত জেল নির্মাণের কাজে।

বিপ্লবীদের রক্ত জল করেই ইংরেজরা লাল ইঁট তৈরি করে জেল নির্মাণের কাজে ব্যবহার করে। বাকি সমস্ত ধরেনর ধাতবীয় পদার্থ নিয়ে আসা হয় বার্মা থেকে।

কালাপানি সেলুলার জেলের (Kalapani jail) নক্সা প্রস্তুত করা হয় তারা মাছের আদলে। তারা মাছের যেমন মধ্য বিন্দু থেকে আলাদা আলাদা ০৫ টি লেজ/ শাখা পঞ্চভুজের মত চারিদিকে ছড়িয়ে থাকে,

আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস
আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেল

ঠিক তেমন সেলুলার জেলের নক্সায় সেন্ট্রাল পয়েন্ট থেকে আলাদা আলাদা করে ০৭ খানা বাহু তৈরি করা হয়। আর এই সেন্ট্রাল পয়েন্টে এক খানা ওয়াচ টাওয়ার

বানানো হয়,এই ওয়াচ টাওয়ারের সাথে জেলের ০৭ খানা বাহু জুড়ে দেওয়া হয় যাতে ওয়াচ টাওয়ার থেকে জেলের ০৭ খানা বাহুতে সমান ভাবে নজর জমানো যায়।

সেলুলার জেলের ০৭ খানা বাহু লম্বায় একরকমের ছিল না জেলের বাহু গুলির লম্বায় ছোট বড় ছিল। কারণ যেখানে কালাপানি সেলুলার জেল তৈরি হয়েছে সেখানে পাহাড় ছিল।

আর এই পাহাড় কেটে সেলুলার জেল নির্মাণ করা হয়েছিল। কালাপানি জেলে মোট ০৩ টি ফ্লোর ছিল। নিচু তলা মানে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ছিল জেলের মধ্যে প্রবেশের প্রধান দরজা।

প্রধান দরজায় প্রবেশ করে ওয়াচ টাওয়ারে সিড়ি বেয়ে দ্বিতীয় তলা এবং তৃতীয় তলায় যাওয়া যেত। তৃতীয় তলায় একটি বড় ঘন্টা বাঁধা ছিল।

জেলের মধ্যে থাকা ঘন্টার ব্যবহার দিনের বেলা সময় জানানো এবং জেলের মধ্যে বড়লাটের মত উচ্চ পদস্থ কর্মচারীর আগমন ঘটলে বাজানো হত।

রাত্রিবেলা এই ঘন্টার ব্যবহার হত আপদকালীন পরিস্থিতিতে,জেল থেকে বন্দী পলায়ন করলে প্রহরীদের সতর্ক করার জন্য এই ঘন্টার ব্যবহার হত।

কালাপানি সেলুলার জেল (Kalapani jail) বানানোর জন্য ব্যায় হয়েছিল ০৮ লক্ষ ভারতীয় মুদ্রা। ভারতীয় স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীদের শায়েস্তা করার জন্য

৬৯৩ কুঠুরি বিশিষ্ট বিশেষ জেল নির্মাণ করা হয়েছিল এবং একসঙ্গে অনেকগুলি সেল থাকায় এই জেলের নাম দেওয়া হয় সেলুলার জেল।

সেলুলার জেলের কুঠুরি গুলো এতো ছোটো করে তৈরি করা হয়েছিল যাতে সেই কুঠুরির মধ্যে ০১ জনের বেশি কয়েদিকে রাখার জায়গা না থাকে।

একটি কুঠুরি থেকে আর একটি কুঠুরির মধ্যে কোনো রকম জানালা রাখা হয়নি,যাতে করে একজন কয়েদি আর একজন কয়েদীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে না পারে।

জেলের কুঠুরির মধ্যে প্রবেশ দরজা ছাড়া কুঠুরির পিছনের দেওয়ালে ০৩ ফুট উঁচুতে একটি ছোট জানালা রাখা হয়েছিল তবে জানালা দিয়ে উত্তাল সমুদ্র ছাড়া আর কিছুই দেখা যেতনা।

কয়েদীদের জন্য আলাদা করে কুঠুরির মধ্যে টয়লেট করার জন্য কোনো টয়লেটের ব্যবস্থা ছিলনা,কয়েদীদের শরীর খারাপ,পেট খারাপের মতো সমস্যা হলে

কুঠুরির মধ্যেই টয়লেট হয়ে গেলে ঐ একই ভাবে কয়েদীকে ময়লা নিয়েই রাত কাটাতে হত,পরের দিন সকালবেলা ছাড়া ময়লা পরিষ্কার করার আর আলাদা করে কোনো উপায় ছিল না।

ফাঁসি সাজা প্রাপ্ত আসামিদের জন্য জেলের ভিতর স্পেশাল কন্ডোম সেলের ব্যবস্থা ছিল। কন্ডোম সেলে থাকাকালীন ফাঁসির আসামিদের সঙ্গে

জেল কর্মীরা ভালো ব্যবহার করতো,তাদিকে ভালো খাবার দেওয়া হত আসামিদের উপর শারীরিক অত্যাচার করা হতো না।

আরো পড়ুন : মিশরের রহস্যময় পিরামিড। 

কালাপানি সাজা কি ?


দোষী সাবস্ত আসামিকে জজ সাহেব নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাবাসের সাজা শোনাত। সময়কে সংস্কৃতে কাল বলা হয় আর পানি হল উর্দু শব্দ যার বাংলা প্রতিশব্দ হল জল।

সেলুলার জেল নির্মাণ করা হয় আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে। যা মূল ভূভাগ থেকে অনেক দূরে,আন্দামানের চারিদিকে অথৈই জল রাশি ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না।

যার জন্য এই সেলুলার জেলের নাম ধীরে ধীরে হয়ে যায় কালাপানি সাজা আর সেলুলার জেলের নাম হয়ে যায় কালাপানি সেলুলার জেল।

একবার কালাপানি সেলুলার জেল (Kalapani jail) থেকে ২৩৮ জন বিপ্লবী বন্দী পালানোর চেষ্টা করে কিন্তু তারা তাদের উদ্দেশ্যে সফল হয়নি। জেল থেকে পালাতে সফল হলেও তারা বাইরে

বেরিয়ে অথৈ জলরাশি ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায়না। ইংরেজরা পুনরায় জেল থেকে পালানো বিপ্লবীদের ধরে ফেলে এবং তাদের উপর প্রচুর পরিমানে অকথ্য অত্যাচার শুরু করে।

তাদের মধ্যে কয়েকজন বিপ্লবী জেলারের অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়।

জেলের মধ্যে আত্মহত্যা করায় জেলার ক্রোধিত হয়ে এক সঙ্গে ৭৮ জনকে জেল থেকে পালানোর অপরাধে ফাঁসি দিয়ে দেয়। 

জেলের মধ্যে থাকা কয়েদীদের জন্য বাঁধা ধরা কোনো সময় বাঁধা ছিলনা। জেলের মধ্যে কয়েদীদের পশুর মতো খাটানো হত আর খাবার দেওয়া হতো যথসামান্য শুধু বেঁচে থাকার জন্য।

জেলবন্দীদের দ্বারা ঘানি ঘুড়িয়ে তেল বার করা হত,কোন বন্দী যদি জেলের ঘানি টানতে অস্বীকার করতো তাহলেই তার পিঠে পড়তো চাবুকের ঘা।

জেল বন্দীদের মাথা পিছু ঘানি টেনে শুকনো নারকেল থেকে ৩০ পাউন্ড নারকেল তেল বার করতে হত। কয়েদীদের মধ্যে কেউ জেলারের প্রতিবাদে উঁচু গলায় কথা বললে

তাকে উলঙ্গ করে ফগিং স্ট্যান্ড (টিকটিক) এ উল্টো করে হাত পা বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হত। তারপর বন্দীর নিতম্বের উপর সাদা এক টুকরো কাপড় রেখে চাবুকের ঘা মারা হত।

চাবুকের ঘায়ে নিতম্ব ফেটে রক্ত বের হয়ে আসত। এর ফলে সেই বন্দীর পরিনতি হতো খুব খারাপ,বন্দী ভালো করে মল ত্যাগ করার জন্য বসতে পারতনা ফাটা চামড়ায় টান পড়তো।

বন্দীকে পাটের তৈরি কাপড় পড়তে দেওয়া হত যাকে পানিশমেন্ট ড্রেস বলা হত। সেই পাটের ড্রেস পড়ে নিতম্বের ফাটা জায়গায় পাটের কাপড়ের ঘষা লেগে চুলকানি হয়ে যেত।

আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেলের ইতিহাস
আন্দামানের কালাপানি সেলুলার জেল

কালাপানি সেলুলার জেলের সাজা এতটাই কষ্টদায়ক ছিল যে,কারো যদি কালাপানি সাজা ঘোষণা হত তাহলে তার পরিবার ধরে নিত সেই ব্যক্তি আর কোনোদিন ফিরে আসবেনা।

সেলুলার জেল বন্দিদের তালিকা


১৯৩০ সালে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুঠের পর বেশ কয়েকজন স্বাধীনতা সংগ্রামী সহ ভগৎ সিংএর বন্ধু মহাবীর সিং কে কালাপানি সাজা কাটার জন্য সেলুলার জেল আন্দামানে পাঠানো হয়।

কিন্তু জেলের (Kalapani jail) মধ্যে চলতে থাকা ইংরেজ জেলারের অকথনীয় অত্যাচার দেখে তিনি জেলের মধ্যে অনশন ধর্মঘট শুরু করেন।

জেলার মহাবীর সিং এর অনশন ভাঙার চেষ্টা করেন কিন্তু তাতে কোনো সুফল হয়না। এইভাবে কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর,মহাবীর সিং এর প্রতি জেলের

বন্দিদের প্রতিপত্তি কমানোর জন্য ইংরেজরা ষড়যন্ত্র করে মহাবীর সিংকে জোড় করে বিষ দুধ পান করিয়ে হত্যা করেন।

এরপর মহাবীর সিং এর লাশের সাথে বড়ো একটা পাথর বেঁধে সমুদ্রের জলে ফেলে দিয়ে আসা হয়। কিন্তু এই খবর ইংরেজররা জেলের মধ্যে ধামা চাপা দিয়ে রাখতে পারেননি

জেলের অন্যান্য কয়েদিরা মহাবীর সিং কে চক্রান্ত করে হত্যা করার প্রতিবাদে জেলের সমস্ত কয়েদি অনশনে নেমে পড়েন। কয়েদিদের অত্যাচার ভাঙার জন্য কয়েদীদের উপর

অকথ্য অত্যাচার চলতে থাকে তবুও তারা তাদের অনশন ভাঙেনি। শেষ পর্যন্ত ৪৫ দিন অনশন চলার পর কয়েদীরা গান্ধীজি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুরোধে অনশন ভাঙেন।

লন্ডনে আইন নিয়ে পড়াশোনা করার সময় ১৯১১ সালে ভারতের বীর সাভাকর নামের একজন স্বাধীনতাকামী বিপ্লবীকে লন্ডন থেকে গ্রেফতার করা করা হয়। 

বীর সাভাকরকে লন্ডন থেকে জলজাহাজে করে ভারতে নিয়ে আসার সময় ফ্রান্সের কাছে জাহাজ এসে পৌঁছালে বীর সাভাকর জলে ঝাঁপ দিয়ে ফ্রান্স পালিয়ে যায়। 

পরে ফ্রান্স পুলিশের হাতে সাভাকর ধরা পড়ে যায় এবং ফ্রান্স পুলিশ সভাকরকে পুনরায় ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়। কোর্টে সাভাকরের ৫০ বছরের কারাবাসের সাজা হয়। 

সাভাকরকে সেলুলার জেলে ১৯১১-১৯২১ সাল পর্যন্ত ১০ বছর বন্দি করে রাখা হয়েছিল। আপনারা জানলে অবাক হবেন কালাপানি জেলে বীর সাভাকরের ভাই 

গণেশ সাভাকরকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল কিন্তু একই জেলে থাকা সত্ত্বেও তারা দুই ভাই এর  একে অপরের সাথে দেখা হয় দুই বছর পরে। 

তারা দুই জনের কেউ জানতনা যে তার দাদা ও ভাই একই জেলে বন্দি আছে। কালাপানি জেলে সাজা কাটার সময় বীর সাভাকরের অনুরোধে জেলের মধ্যে একটা ছোট 

গ্রন্থাগার খোলা হয়। কালাপানি জেলে ১০ বছর সাজা কাটার পর ১৯২১ সালে বীর সাভাকরকে মহারাষ্টের রত্নগিরি জেলে ০৩ বছরের সাজা কাটার জন্য স্থানান্তর করা হয়। 

এইভাবে ১৯২১ সাল পর্যন্ত সাভাকর রত্নগিরি জেলে সাজা কাটেন এবং বাকি ০৫ বছর ইংরেজ সরকার কোনো রকম রাজনৈতিক আন্দোলনে যোগাযোগ না 

রাখার শর্তে গৃহবন্দী হয়ে থাকার অবসর দেন। ১৯৮৬ সালে ৮৩ বছর বয়সে বীর সাভাকর মারা যান। সেলুলার জেল (Kalapani jail) বন্দিদের তালিকায়

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগের তালিকার দীর্ঘ সূচি রয়েছে। তাঁদের মধ্যে-বটুকেশর দত্ত,বীর সাভাকর, মাওলানা আহমদুল্লা,এস.চন্দ্র চ্যাটার্জী প্রভৃতির নাম উল্লখযোগ্য।

কালাপানি সেলুলার জেলে আজাদ হিন্দ ফৌজের পতাকা উত্তোলন


 আন্দামানের বুকে পৌত্রুগিজ,ডাচ ও ইংরেজরা শাসন করেছেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধ চলার সময় ১৯৪২ সালে জাপানিরা আন্দামান আক্রমন করে 

ব্রিটিশদের কাছ থেকে কালাপানি জেলের (Kalapani jail) দখল নিয়ে নেয় এবং ইংরেজদের তৈরী করা কালাপানি জেলে ইংরেজদেরই বন্দি করে দেয়। 

যুদ্ধের সময় বোম্বিংয়ের জন্য জেলের দুটি উইং নষ্ট হয়ে যায়। এরপর জাপানিরা আন্দামানকে নেতাজীর হাতে তুলে দেয় এবং এখানেই নেতাজী প্রথম স্বাধীন ভারতের পতাকা উত্তোলন করেন। 

১৯৪৪ সালে ইংরেজরা জাপানিদের কাছ থেকে আন্দামান পুনঃদখল করে নেয় কিন্ত যুদ্ধের পর থেকে ইংরেজরা এখানে কয়েদি রাখা বন্ধ করে দেয়। 

সেলুলার জেল আন্দামানে রাষ্ট্রীয় স্মৃতি স্মারকের প্রতিষ্ঠা


১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা লাভ করে এরপর ১৯৪৯ সালে আন্দামানে ভূমিকম্প হলে কালাপানি জেলের আরো দুটি উইং ধ্বংস হয়ে যায়। 

পরবর্তীকালে আন্দামান প্রশাসন ভাঙা উইংয়ের ধংসাবশেষ সরিয়ে নিয়ে সেখানে ১৯৬৪ সালে ৫০০ বেডের জি.বি.পন্থ নামের একটি হাসপাতাল তৈরি করেন। 

আন্দামানের কালাপানি জেলে এখন পর্যন্ত কতজনকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে তার কোনো লিখিত দলিল পাওয়া যায়না,তবে অনেকের মতে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় বোম্বিংয়ের কারণে 

সেই নথিপত্র ধ্বংস হয়ে যায়। আবার কারো মতে কালাপানি জেলে এতবেশি পরিমানে মানুষকে ফাঁসি কাঠে চড়ানো হয়েছিল যে ইংরেজরা সেই রেকর্ড প্রকাশ্যে আনতে চাননি। 

তাই তারা সেখানে সমস্ত রেকর্ড সাথে করে নিজের সঙ্গে নিয়ে যান। আন্দামানের জেলে যে কুখ্যাত জেলার ছিলেন তাদের নাম হল – ০১. ডেভিড কাদি এবং ০২.আর.কে.টম ম্যাকুলাম। 

১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী ভারত সরকার কালাপানি সেলুলার জেলকে রাষ্ট্রীয় স্মৃতি স্মারক হিসাবে ঘোষণা করেন এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যাওয়া ০২ টি উইংকে সরিয়ে 

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে শহীদদের উদ্দেশ্যে শহীদ মঞ্চ এবং তার পাশে একটি জ্বলন্ত অগ্নি শিখা বাতি ফ্লাম তৈরি করা হয়। শহীদ মঞ্চের পাশে ২৪ ঘন্টা ০২ খানা ফ্লাম জ্বলতে দেখা যায়,

যার জন্য প্রতি মাসে ২৪+২৪ মোট ৪৮ খানা গ্যাস সিলিন্ডারের প্রয়োজন হয়। এই গ্যাস সিলিন্ডারের নিয়মিত বিনামূল্যে যোগান দেওয়া হয় Indian Oil Corporation দ্বারা। 

FAQ


প্রশ্নঃ কালাপানি কি ?                                                                                                        উঃ সেলুলার জেলকে কালাপানি বলা হয়। 

প্রশ্নঃ সেলুলার জেল কোথায় অবস্থিত ?                                                                                   উঃ সেলুলার জেল আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত। 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here